মো. নূর নবী শেখ
বিশ বছরেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে চূড়ান্তভাবে সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবারের মধ্যে দেশটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর শেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখলেও ইরাকের কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক এর ফলে ইরানে সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন। খবর রয়টার্স’র।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে জড়িত রয়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায়ে কৌশলগতভাবে ইরান লাভবান হতে পারে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তায় তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি।
ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন প্রত্যাহারকে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান উদযাপন করবে তাদের গোষ্ঠী।
‘ইরাক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়’
ইরাকে মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত প্রত্যাহারের পক্ষে সমর্থন থাকলেও দেশটির কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক মনে করছেন, এই মুহূর্তে প্রত্যাহারটি নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ইরাক এখনো পুরোপুরি দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তার মতে, সব ইরাকি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চাইলেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের চলে যাওয়ার ফলে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে দীর্ঘ সময় দেশটিতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখে তারা। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন বাহিনী ইরাক থেকে প্রত্যাহার করা হলেও ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর ২০১৪ সালে আবারও ইরাকে ফিরে আসে মার্কিন সেনারা। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইএসবিরোধী অভিযানে তারা ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সময়ে দেশটি দুই পক্ষের পরোক্ষ সংঘাতের ক্ষেত্রও হয়েছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে; জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা করেছে।
ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় হিসেবে দেখছে তেহরান
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের দাবি করে আসছে। দেশটি ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তাদের আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গঠিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় হিসেবে দেখছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম বলেন, ইরাক ও অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনারা চলে গেলে সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইরান মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়াগুলো তেহরানের নির্দেশনায় আঞ্চলিক সংঘাতে ভূমিকা রাখছে। বাগদাদ সরকার এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে।
মার্কিন বাহিনী সরে গেলে আইএস কি আবার সক্রিয় হবে?
মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারে ইসলামিক স্টেট নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
প্রায় এক দশক আগে আইএসের ঘোষিত ‘খিলাফত’ পরাজিত হলেও গোষ্ঠীটির এখনো ঘুমন্ত সেল বা গোপন নেটওয়ার্ক রয়েছে। একসময় তারা ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ সহায়তা ও ড্রোন সুবিধা না থাকায় আইএস নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তার দাবি, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক জোটের প্রত্যাহারের খবর প্রকাশের পর গত দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে আইএসের ঘুমন্ত সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল। ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, এ ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে দীর্ঘদিন সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও নিরাপত্তার ফাঁক কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা এখনো গোষ্ঠীটির রয়েছে।
কিরকুকের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি বলেন, আইএস এখনো শক্তিশালী এবং রক্তক্ষয়ী হামলা চালাতে সক্ষম—এমন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং আইএসের পুনরুত্থানের ঝুঁকি কতটা বাড়ে, তা এখন দেশটির সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com